সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। গত সপ্তাহের বুধবার থেকে এ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ-বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি কোটা পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগে সমতা আনতে হবে।
৩৪ তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলা ঘোষিত হওয়ার পর কোটা বিষয়ে অনুত্তীর্ণদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। এবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ২ লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ১২ হাজার ৩৩ জন। প্রার্থীরা মনে করছেন, প্রিলিমিনারির ফলেও কোটা পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে।
দেশে মোট ৫৬ শতাংশ সরকারি পদ কোটাধারীদের জন্য সংরক্ষিত। আর বাকি ৪৪ শতাংশ পদ সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য, যারা মেধার ভিত্তিতে নির্বাচিত হন, চাকরি পান। তার ওপর এবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রেও কোটা প্রথা অনুসরণ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক মেধাবী প্রার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। দেখা যাচ্ছে, কোটার কারণে কেউ ৫০ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছেন,অথচ ৮০ নম্বর পেয়েও অনেকে উত্তীর্ণ হতে পারছেন না। স্বভাবতই এক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন হলো,পিএসসির পরীক্ষার ক্ষেত্রে এতদিন প্রিলিমিনারি কিংবা লিখিত পরীক্ষায় এতদিন কোটা অনুসরণ করা হয়নি। এই প্রথম ৩৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পর্যায় থেকেই কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ করল কেন পিএসসি? সরকারের শেষ সময়ে এসে পিএসসি নতুন করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি কেন করলো তা বোধগম্য নয়।
পরীক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতাকে অস্বীকারের উপায় নেই। একদিকে দুর্নীতি ও দলীয় আনুগত্য ভিত্তিক স্বজনপ্রীতির পথ খোলা রাখার জন্যই যে কোটা পদ্ধতি সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রশাসনকে সম্পূর্ণ মেধাশূন্য করার হীন উদ্দেশ্য নিয়েই পিএসসির কোনো মহল থেকে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কোটা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।
আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধা, জেলা ও নারী কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ সরকারি পদ কোটাধারীদের জন্য সংরক্ষিত। এখানে মেধার ভিত্তিতে বাছাইয়ের সুযোগ অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। মেধার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাকি ৪৪ শতাংশ। এটা সংবিধান ও মানবাধিকারের পরিপন্থি। নিয়োগ পদ্ধতিকে মেধাশূন্য করারই নামান্তর। সবার জন্য অবারিত সুযোগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। সরকারি প্রশাসনে ৫৬ শতাংশই যদি মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্ত না হয়, তাহলে এই প্রশাসন সম্পূর্ণ মেধাশূন্য হতে আর সময় লাগবে কি? অন্যদিকে ৪৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি ও টাকার খেলার সুযোগ। সুতরাং বলা যায় ৮০ শতাংশই মেধাহীন বাছাইয়ে নিয়োগ হচ্ছে। কোন সর্বনাশা ভাবনায় পিএসসি এভাবে এগোচ্ছে সেটাই প্রশ্ন।
অন্যদিকে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতিতেও রয়ে গেছে বৈষম্য। পঞ্চম আদমশুমারি, গৃহগণনা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায় দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ আদিবাসীর জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকছে ৫ ভাগ। ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য ১ ভাগ এবং দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটা থাকছে ৩০ ভাগ। অর্থাৎ সার্বিক অর্থে বলা যায়, ৫৬ শতাংশ কোটার ৩৬ শতাংশই উল্লিখিতদের জন্য সংরক্ষিত।
চাকরি ক্ষেত্রে কোটা প্রথা অনেক দেশেই চালু আছে। তবে মূলত তা সংরক্ষিত রাখা হয় সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির জন্যে। আমাদের দেশে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা সংরক্ষণ ছাড়াও জেলা ও নারী কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় চাকরির ক্ষেত্রে সমাজের অনগ্রসর মানুষের জন্যে কোটা ব্যবস্থার পেছনে একটি ইতিবাচক উদ্দেশ্য রয়েছে। মূলধারায় তালমিলিয়ে চলতে গিয়ে সমাজের অনগ্রসর মানুষের টেনে আনার জন্যে রাষ্ট্রের করণীয় যা রয়েছে রাষ্ট্র তা যথাযথভাবে পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোটাপদ্ধতি যদি চিরন্তন একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয় এবং তা যদি বিতর্কের জন্ম দেয় তবে রাষ্ট্রকে অবশ্যই তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। উদ্ভূত সমস্যা মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেকেই বলছেন কোটা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে আবার কেউ কেউ বলছেন কোটা পদ্ধতি সংশোধন করতে হবে। কোটা নিয়ে পক্ষ বিপক্ষে বিতর্ক চলছে।
সংবিধানের ২৯ ধারার উল্লেখ আছে
২৯ (১): প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।
২৯ (২): কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।“
এই ভাবে ‘সুযোগের সমতা’কে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর, সংবিধানে আবার অনগ্রসর অংশের জন্য ‘নিয়োগ সংরক্ষণ’ বা কোটা রাখারও অনুমোদন দেয়া হয়েছে:
২৯ (৩): এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই
(ক) নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে,
(খ) কোন ধর্মীয় বা উপ-সমপ্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপ-সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোন আইন কার্যকর করা হইতে,
(গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোন শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইতে,
রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।
আগেই বলা হয়েছে, কোটাব্যবস্থা বৈষম্যের শিকার হওয়া ‘পিছিয়ে পড়া’ জনগোষ্ঠী কিংবা শ্রেণির জন্যে প্রযোজ্য হতে পারে। দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা আলাদাভাবে বৈষম্যের শিকার বা ‘পিছিয়ে পড়া’ জনগোষ্ঠী নয়; দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যে মাত্রায় ‘পিছিয়ে পড়া’,মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও সে মাত্রায় পিছিয়ে পড়া। কেবল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হওয়ার জন্য কারও শিক্ষা কিংবা চাকুরির সমস্যা হয় – এ রকমটা কখনও ঘটে না, যেমনটা হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিংবা প্রতিবন্ধীদের। মুক্তিযুদ্ধের সন্তানদের জন্য সরকারি চাকুরিতে ৩০ শতাংশ কোটা রাখার কোন যুক্তি নেই। ১০ শতাংশ জেলা কোটা রাখারও দরকার নেই।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন স্বাধীন কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুললে শিক্ষা-বস্ত্র-বাসস্থান-কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক অধিকারগুলো শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদেরই নয়, দেশের সকল নাগরিকেরই প্রাপ্য হতো, এর জন্য কোটা ব্যবস্থার মতো একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজন হতো না।
মুক্তিযোদ্ধাদের যদি সম্মান দিতে হলে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা-ঘুষ দিয়ে নয়, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার শোষণ-বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়েই দিতে হবে।
বিষয়টি অনুধাবন করে কোটা প্রথা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসা দরকার। অনগ্রসর শ্রেণির জন্যে কোটা রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিলেও স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পর জন্ম নেয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। এ নিয়ে এ প্রজন্মের মধ্যে কিছুটা চাপাক্ষোভ রয়েছে এটা স্বীকার করতে কার্পণ্যবোধ করি না। অথচ এ খাতে কোটার পরিমাণ ৩০ শতাংশ। বর্তমান বাস্তবতায় জেলা ও নারী কোটা সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও খুব বেশি যুক্তি নেই।
চাকরি ক্ষেত্রে কোটা প্রথা যদি রাখতেই হয়, তবে তা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে এবং সেক্ষেত্রেও প্রার্থীদের সুযোগ দিতে হবে মেধার ভিত্তিতে।
প্রকৃতপক্ষে চাকরির নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। কোটা প্রথাকে অগ্রাধিকার দেয়ায় প্রকৃত যোগ্য ও মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রশাসনে নিয়োগ পাচ্ছেন অযোগ্য ও কম মেধাবীরা। এটা কোনোমতেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এর প্রভাব পড়ছে প্রশাসনসহ সামগ্রিকভাবে সরকারি কর্মক্ষেত্রে, যার প্রকাশ ঘটছে নানাভাবেই।
কোটা পদ্ধতিকে সংবিধান ভিত্তিক করতে হবে সমাজে বিদ্যমান অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কোটা পদ্ধতির পেছনে অবশ্যই যুক্তি আছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত কোটা এটাও কাম্য নয়। কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল নয় বরং সংশোধন করে এর গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি।
৩৪ তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলা ঘোষিত হওয়ার পর কোটা বিষয়ে অনুত্তীর্ণদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। এবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ২ লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ১২ হাজার ৩৩ জন। প্রার্থীরা মনে করছেন, প্রিলিমিনারির ফলেও কোটা পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে।
দেশে মোট ৫৬ শতাংশ সরকারি পদ কোটাধারীদের জন্য সংরক্ষিত। আর বাকি ৪৪ শতাংশ পদ সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য, যারা মেধার ভিত্তিতে নির্বাচিত হন, চাকরি পান। তার ওপর এবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রেও কোটা প্রথা অনুসরণ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক মেধাবী প্রার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। দেখা যাচ্ছে, কোটার কারণে কেউ ৫০ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছেন,অথচ ৮০ নম্বর পেয়েও অনেকে উত্তীর্ণ হতে পারছেন না। স্বভাবতই এক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন হলো,পিএসসির পরীক্ষার ক্ষেত্রে এতদিন প্রিলিমিনারি কিংবা লিখিত পরীক্ষায় এতদিন কোটা অনুসরণ করা হয়নি। এই প্রথম ৩৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পর্যায় থেকেই কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ করল কেন পিএসসি? সরকারের শেষ সময়ে এসে পিএসসি নতুন করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি কেন করলো তা বোধগম্য নয়।
পরীক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতাকে অস্বীকারের উপায় নেই। একদিকে দুর্নীতি ও দলীয় আনুগত্য ভিত্তিক স্বজনপ্রীতির পথ খোলা রাখার জন্যই যে কোটা পদ্ধতি সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রশাসনকে সম্পূর্ণ মেধাশূন্য করার হীন উদ্দেশ্য নিয়েই পিএসসির কোনো মহল থেকে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কোটা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।
আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধা, জেলা ও নারী কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ সরকারি পদ কোটাধারীদের জন্য সংরক্ষিত। এখানে মেধার ভিত্তিতে বাছাইয়ের সুযোগ অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। মেধার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাকি ৪৪ শতাংশ। এটা সংবিধান ও মানবাধিকারের পরিপন্থি। নিয়োগ পদ্ধতিকে মেধাশূন্য করারই নামান্তর। সবার জন্য অবারিত সুযোগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। সরকারি প্রশাসনে ৫৬ শতাংশই যদি মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্ত না হয়, তাহলে এই প্রশাসন সম্পূর্ণ মেধাশূন্য হতে আর সময় লাগবে কি? অন্যদিকে ৪৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি ও টাকার খেলার সুযোগ। সুতরাং বলা যায় ৮০ শতাংশই মেধাহীন বাছাইয়ে নিয়োগ হচ্ছে। কোন সর্বনাশা ভাবনায় পিএসসি এভাবে এগোচ্ছে সেটাই প্রশ্ন।
অন্যদিকে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতিতেও রয়ে গেছে বৈষম্য। পঞ্চম আদমশুমারি, গৃহগণনা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায় দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ আদিবাসীর জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকছে ৫ ভাগ। ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য ১ ভাগ এবং দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটা থাকছে ৩০ ভাগ। অর্থাৎ সার্বিক অর্থে বলা যায়, ৫৬ শতাংশ কোটার ৩৬ শতাংশই উল্লিখিতদের জন্য সংরক্ষিত।
চাকরি ক্ষেত্রে কোটা প্রথা অনেক দেশেই চালু আছে। তবে মূলত তা সংরক্ষিত রাখা হয় সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির জন্যে। আমাদের দেশে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা সংরক্ষণ ছাড়াও জেলা ও নারী কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় চাকরির ক্ষেত্রে সমাজের অনগ্রসর মানুষের জন্যে কোটা ব্যবস্থার পেছনে একটি ইতিবাচক উদ্দেশ্য রয়েছে। মূলধারায় তালমিলিয়ে চলতে গিয়ে সমাজের অনগ্রসর মানুষের টেনে আনার জন্যে রাষ্ট্রের করণীয় যা রয়েছে রাষ্ট্র তা যথাযথভাবে পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোটাপদ্ধতি যদি চিরন্তন একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয় এবং তা যদি বিতর্কের জন্ম দেয় তবে রাষ্ট্রকে অবশ্যই তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। উদ্ভূত সমস্যা মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেকেই বলছেন কোটা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে আবার কেউ কেউ বলছেন কোটা পদ্ধতি সংশোধন করতে হবে। কোটা নিয়ে পক্ষ বিপক্ষে বিতর্ক চলছে।
সংবিধানের ২৯ ধারার উল্লেখ আছে
২৯ (১): প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।
২৯ (২): কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।“
এই ভাবে ‘সুযোগের সমতা’কে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর, সংবিধানে আবার অনগ্রসর অংশের জন্য ‘নিয়োগ সংরক্ষণ’ বা কোটা রাখারও অনুমোদন দেয়া হয়েছে:
২৯ (৩): এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই
(ক) নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে,
(খ) কোন ধর্মীয় বা উপ-সমপ্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপ-সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোন আইন কার্যকর করা হইতে,
(গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোন শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইতে,
রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।
আগেই বলা হয়েছে, কোটাব্যবস্থা বৈষম্যের শিকার হওয়া ‘পিছিয়ে পড়া’ জনগোষ্ঠী কিংবা শ্রেণির জন্যে প্রযোজ্য হতে পারে। দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা আলাদাভাবে বৈষম্যের শিকার বা ‘পিছিয়ে পড়া’ জনগোষ্ঠী নয়; দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যে মাত্রায় ‘পিছিয়ে পড়া’,মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও সে মাত্রায় পিছিয়ে পড়া। কেবল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হওয়ার জন্য কারও শিক্ষা কিংবা চাকুরির সমস্যা হয় – এ রকমটা কখনও ঘটে না, যেমনটা হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিংবা প্রতিবন্ধীদের। মুক্তিযুদ্ধের সন্তানদের জন্য সরকারি চাকুরিতে ৩০ শতাংশ কোটা রাখার কোন যুক্তি নেই। ১০ শতাংশ জেলা কোটা রাখারও দরকার নেই।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন স্বাধীন কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুললে শিক্ষা-বস্ত্র-বাসস্থান-কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক অধিকারগুলো শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদেরই নয়, দেশের সকল নাগরিকেরই প্রাপ্য হতো, এর জন্য কোটা ব্যবস্থার মতো একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজন হতো না।
মুক্তিযোদ্ধাদের যদি সম্মান দিতে হলে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা-ঘুষ দিয়ে নয়, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার শোষণ-বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়েই দিতে হবে।
বিষয়টি অনুধাবন করে কোটা প্রথা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসা দরকার। অনগ্রসর শ্রেণির জন্যে কোটা রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিলেও স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পর জন্ম নেয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। এ নিয়ে এ প্রজন্মের মধ্যে কিছুটা চাপাক্ষোভ রয়েছে এটা স্বীকার করতে কার্পণ্যবোধ করি না। অথচ এ খাতে কোটার পরিমাণ ৩০ শতাংশ। বর্তমান বাস্তবতায় জেলা ও নারী কোটা সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও খুব বেশি যুক্তি নেই।
চাকরি ক্ষেত্রে কোটা প্রথা যদি রাখতেই হয়, তবে তা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে এবং সেক্ষেত্রেও প্রার্থীদের সুযোগ দিতে হবে মেধার ভিত্তিতে।
প্রকৃতপক্ষে চাকরির নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। কোটা প্রথাকে অগ্রাধিকার দেয়ায় প্রকৃত যোগ্য ও মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রশাসনে নিয়োগ পাচ্ছেন অযোগ্য ও কম মেধাবীরা। এটা কোনোমতেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এর প্রভাব পড়ছে প্রশাসনসহ সামগ্রিকভাবে সরকারি কর্মক্ষেত্রে, যার প্রকাশ ঘটছে নানাভাবেই।
কোটা পদ্ধতিকে সংবিধান ভিত্তিক করতে হবে সমাজে বিদ্যমান অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কোটা পদ্ধতির পেছনে অবশ্যই যুক্তি আছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত কোটা এটাও কাম্য নয়। কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল নয় বরং সংশোধন করে এর গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি।
উৎসঃ পরিবর্তনডটকম

Post a Comment